হুবহু বলতে পারতেন গত জন্মের কথা! রহস্যময়ী শান্তিদেবী অবাক করেছিলেন স্বয়ং গান্ধীকেও

মথুরা থেকে দিল্লি এসেছেন পণ্ডিত কেদারনাথ চৌবে নামক এক ব্যবসায়ী। জরুরি চিঠি দিয়ে তাঁকে জানানো হয়েছে ভারতের রাজধানীতে নাকি এমন এক শিশুকন্যার আবির্ভাব ঘটেছে যে নাকি নিজেকে কেদারের গত জন্মের স্ত্রী ‘লুগডি’ বলে দাবি করছে। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কেদারনাথও অস্থির হয়ে উঠেছেন। কারণ তাঁর স্ত্রী গত হয়েছেন বেশ কিছুদিন হল।মরা মানুষ কি ফিরে আসতে পারে নাকি? এ যে ভৌতিক ব্যাপার।

দিল্লি পৌঁছে কেদারনাথ ঠিক করলেন এই তথাকথিত ‘জাতিস্মরে’র বাড়িতে প্রথমেই নিজে যাবেন না। নিজের ভাইকে কেদারনাথ সাজিয়ে পাঠাবেন তিনি। কথা মতো কেদারনাথের ভাই তাঁর দাদার নাম ধরে গিয়ে পৌঁছলেন সেই শিশুকন্যার বাড়িতে। মেয়েটা তাঁকে ঠিক এক ঝলক দেখেই গড়গড় করে বলতে লাগল তাঁর নাম,ধাম,পরিচয়। কেদারের ভাইয়ের চোখ কপালে উঠে গেল। দাদার কাছে এসে তিনি বললেন, ‘ভাইয়াজী, আপনি চলুন। আমার ব্যাপার সুবিধের মনে হচ্ছে না।’ এবার কেদারনাথকে দেখামাত্র মাটিতে লুটোপুটি করে কাঁদতে আরম্ভ করল সেই কিশোরী, ভারতবাসী যাঁকে চিনেছিলেন ‘জাতিস্মর’ শান্তিদেবী নামে।

শান্তিদেবীর জন্ম ১৯২৬ সালের ১১ ডিসেম্বর দিল্লি শহরে। কিন্তু তাঁর বয়স কিছুটা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেখা দিল সমস্যা। শান্তিদেবীর মা অবাক হয়ে দেখতেন মেয়ে তাঁর খালি অসংলগ্ন কথাবার্তা বলে। কোনোকিছুর সূত্র ধরে সে পৌঁছে যায় পূর্বজন্মের প্রসঙ্গে এবং তাঁদের সামনে তুলে ধরে অদ্ভুত সমস্ত তথ্য। শান্তি দেবীর যখন ন’ বছর বয়স হল তখন তিনি ঘোষণা করলেন, গত জন্মে তাঁর শ্বশুরবাড়ি ছিল মথুরাতে, সেখানে সবাই তাঁকে ডাকতেন ‘লুগডি’ বলে। আগের জন্মে তাঁর স্বামীর নাম নাকি ছিল পণ্ডিত কেদারনাথ চৌবে। এমনকী তাঁর চেহারার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনাও তিনি দিলেন।

ইতিমধ্যে তাঁর এক আত্মীয় ঠিক করেছিলেন তাঁর কথাগুলো যাচাই করে দেখবেন। সেই হিসেবে তিনি মথুরায় কেদারনাথকে একটা চিঠিতে গোটা ঘটনাটা লিখে পাঠিয়ে দেন। চিঠি পেয়ে তো কেদারনাথ ছুটতে ছুটতে দিল্লি এলেন। তারপর, তাজ্জব ব্যাপার। এমনও হয়? তাঁর দাম্পত্য জীবনের এমন কিছু কথা, যেগুলো একমাত্র তাঁর স্ত্রী ছাড়া কারুর পক্ষেই জানা সম্ভব নয়, সেগুলো অবলীলাক্রমে বলে দিলেন শান্তিদেবী। কেদারনাথের মেনে না নিয়ে উপায় রইল না যে ইনিই তাঁর স্ত্রী। তারপর সংবাদপত্রে শান্তি দেবীকে নিয়ে শোরগোল পড়ে গেল। কালক্রমে গান্ধীজি জানতে পারলেন যে দিল্লিতে নাকি এক জাতিস্মরের আগমন ঘটেছে। ১৯৩৫ সালে তিনি নিজে গিয়ে দেখেও এলেন শান্তিদেবীকে।

তারপর তাঁকে নিয়ে বিশেষ গবেষণার উদ্দেশ্যে ১২ জনের একটা কমিটি তৈরি করলেন। নামী সাংবাদিক থেকে আরম্ভ করে গবেষক নিয়ে সেই কমিটি ছিল রীতিমত ওজনদার। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই কমিটি সিদ্ধান্ত নিয়ে শান্তিদেবীকে নিয়ে মথুরা পৌঁছয়। নির্দিষ্ট স্টেশনে নেমে একটা গাড়িতে উঠে তাঁরা চালককে বলেন সেই কিশোরীর নির্দেশ মতো চালাতে। চৌড়াই ধরে চলতে শুরু করল গাড়ি। শান্তিদেবী বড় বড় চোখে জানালার বাইরে দেখেন এবং থেকে থেকেই বলে ওঠেন, ‘আরে রাম, এখানেও বাড়ি উঠে গেছে? এ জমি তো আগে সন্নাটা ছিল।’ কমিটির লোকজন চালককে জিগেস করেন, ‘এ মেয়ে কি ঠিক বলছে?’

চালক উত্তর দেন, ‘মেয়ে একদম ঠিক বলছে, সত্যিই এ জমি আগে ফাঁকা ছিল। কিছুদিন আগে বাড়ি উঠেছে।’ এই করতে করতে শান্তিদেবী সকলকে সঠিক পথ দেখিয়ে নিজের গতজন্মের শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে গিয়ে হাজির করেন। ইতিপূর্বে গতজন্মের স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে শান্তিদেবী জানিয়েছেন যে শ্বশুরবাড়ির এক গোপন স্থানে একটা বাক্সের ভেতর তিনি কিছু টাকাপয়সা জমিয়ে রেখেছিলেন। এবার একজন গবেষক তাঁকে বলেন, ‘দেখি তো সেই বাক্স বের করতে পার কিনা।’ শান্তিদেবী এক সেকেন্ডও বিলম্ব না করে সোজা বাড়ির কাঠের মেঝের তলা থেকে বের করে আনেন সেই বাক্স। কিন্তু বাক্স খুলে দেখা যায় ভেতরে যে একটা পয়সাও নেই।

কেদারনাথ তখন মুখ কাঁচুমাচু করে বলেন, ‘ওর মৃত্যুর পর আমিই বাক্স থেকে টাকাগুলো সরিয়েছিলাম।’ শান্তিদেবীর আচরণের কোনও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি বড় বড় তাত্ত্বিকরা। ১৯৫৮ সালে এক সাংবাদিককে দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন নিজের জীবন নিয়ে। পৃথিবীর মানুষ জাতিস্মরের গল্প জানতে পারলেন আরও বিশদে। তারপর ১৯৮৭ সালে ৬১ বছর বয়সে দুই জন্মের স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন ভারতবর্ষের ‘ওয়ান্ডার ওম্যান’ শান্তিদেবী।